ধর্ম নিয়ে কটূক্তিকারী কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্য তার সম্প্রদায়কে দোষী করা যাবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
চট্টগ্রামে ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন এবং নৈতিক শিক্ষার প্রসারে মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের ভূমিকা শীর্ষক’ এক কর্মশালায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম-ষষ্ঠ পর্যায়ের চট্টগ্রাম জেলার কর্মশালাটি সোমবার পিটিআই সম্মেলন কক্ষে আয়োজন করা হয়।
উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, “সারা দুনিয়াব্যাপী একটা মিথ্যা প্রচার চালানো হয় যে, এখানে সংখ্যালঘুরা উদ্বিগ্ন, উৎকন্ঠিত।
“এই যে জন্মাষ্টমী পালন হল, বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে অনেকে ছিলেন। আমরা শত শত সনাতন ধর্মাবলম্বীকে দেখেছি। এবং আমাদের একজন উপদেষ্টা–মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা চট্টগ্রামে এসে উনাদের সাথে জন্মাষ্টমী উদযাপন করেছেন।”
তিনি বলেন, “এ দেশ আমাদের সবার। আসুন আমরা এদেশকে ভালোবাসি। দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য এটাকে আমরা ধরে রাখি, লালন করি।
“বাংলাদেশের আশেপাশে আরো দেশ আছে। একটু চোখ বুলাই না ডানে-বামে। হোয়াট ইজ দ্য কনডিশন অব দি মাইনরিটিজ। সে তুলনায় বাংলাদেশ রোল মডেল হতে পারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির।”
উপদেষ্টা বলেন, “এ কথা আমার স্বীকার করতে কোনো অসুবিধা হবে না যে, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। আপনারা যদি স্পেসিফিক মামলা দেন, আমরা তাকে ধরে আইনের আওতায় নিয়ে আসব।
“আরেকটা কথা বলি। ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করা; হিন্দু হোক, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা মুসলমান–এটা অপরাধ। আপনি কোনো দেবদেবীকে গালি দেবেন, কোন ধর্মীয় নেতাকে গালি দেবেন, কোনো পয়গম্বরকে গালি দেবেন, কোনো পুরোহিতকে গালি দেবেন, আজেবাজে কথা বলবেন। এটা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে দেয়। সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
“আমরা তাকে ধরে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশ্রুতিবদ্ধ। এর রিপারকেশন হিসেবে ওই ব্যক্তির বাড়ি, তার আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ভেঙে দেওয়া–এটাও ফৌজদারি অপরাধ। কারণ এই ব্যক্তি অপরাধী। ব্যক্তির অপরাধের জন্য সম্প্রদায়কে দোষী করা যাবে না। এটা যারা করবে, আমরা তাদেরকে আইনের আওতায় আনব।”
খালিদ হোসেন বলেন, “যে ব্যক্তি দোষ করেছে, তার বিচার হোক। এটাকে আমরা হালকা ভাবে দেখলে হবে না। যে কোনো ধর্মের হোক। ধর্ম নিয়ে ফেইসবুকে আজেবাজে কথা লেখাটা অপরাধ। অশালীন বক্তব্য আমাদের সামাজিক সুন্দর পরিবেশকে, সম্প্রীতির বন্ধনকে নষ্ট করে দেয়।
“সে অপরাধে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আমাদের আইন আছে। তার বিচার হবে সাক্ষী প্রমাণ নিয়ে। কেউ আমাকে ট্যাগ করে দিল, আর আমার ফেইসবুকে চলে আসছে। নাকি আমি পোস্ট করেছি- এগুলো এখন বের করা যায়।”
তিনি বলেন, “এর জন্য ওই সম্প্রদায়ের মানুষজনের বাড়ি ঘর আগুন দেওয়া এটা ফৌজদারি অপরাধ। আমরা এটাকে কোনোদিন প্রশ্রয় দেব না। আমরা অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখতে চাই, তার ধর্ম পরিচয় বড় নয়।”
ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “এ দেশ আমাদের সবার। প্রত্যেকের তার ধর্ম পালনের অধিকার আছে। ধর্ম চর্চা আমাদের নৈতিকতা জাগ্রত করবে, চেতনাকে শানিত করবে। সহনশীলতা এটা বড় গুণ। আসুন সহনশীলতার মানসিকতা আমরা গড়ে তুলি।”
সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রাম কারাগার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “জেলে যাওয়া মানে অপরাধী নয়। আমাদেরও ভুল ধারণা আছে। জেলে যারা যায় সবাই অপরাধী নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কনভিকটেড অ্যান্ড সেন্টেন্সড বাই দি কমপিটেন্ট কোর্ট না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি অপরাধী নন।
“মিথ্যা মামলায়ও আপনাকে ঢুকাই দিতে পারে। অথবা আপনাকে সন্দেহভাজন হিসেবেও নিয়ে যেতে পারে। ৫৪ ধারা যেটাকে বলে। অতএব ভালো মানুষও জেলখানার ভিতর আছে। খারাপ মানুষও আছে, অপরাধীও আছে। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামিও আছে।”
হিন্দুদের বেদখল হওয়া দেবোত্তর সম্পত্তি উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “সীতাকুণ্ডে খুব সম্ভবত দুই দিক থেকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মন্দিরে যাওয়া যায়। আমি যখন এমএ পাস করি, সীতাকুণ্ডে আমার এক বন্ধু ছিল। তার দাওয়াতে যাই। সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি সরু পথ খুব বিপদসঙ্কুল।
“ওখান থেকে পা পিছলায়ে পড়লে আপনাকে আর পাওয়া যাবে না। একটা পথ আছে মানুষ ওটা দিয়ে উঠে। আরেকটা অন্য দিক দিয়ে পথ আছে।”
তিনি বলেন, “আপনারা খোঁজ নেন, দেবোত্তর সম্পত্তি যদি নিষ্কন্টক হয়, কোনো মামলা যদি কোর্টে পেন্ডিং না থাকে, আমাদেরকে জানান। আমরা গভার্নমেন্ট গিয়ে দেবোত্তর সম্পত্তি উদ্ধার করে দেব। মতিঝিলে লক্ষ্মী নারায়ণ জিউর মন্দির এটা আমরা উদ্ধার করে দিয়েছি।”
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শরীফ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দীপক কুমার পালিত, পরিমল কান্তি শীল, অ্যাডভোকেট পার্থ পাল চৌধুরী, উপ-প্রকল্প পরিচালক নিত্য প্রকাশ বিশ্বাস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামের পরিচালক সরকার সরোয়ার আলম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
