চট্টগ্রাম কাস্টমসের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে শুরু

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছে। গত রাত থেকে শুরু হয়েছে রপ্তানিমুখী পণ্য বোঝাই কন্টেনার জাহাজিকরণের কার্যক্রম। তবে আমদানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার খালাসের কাজ শুরুর ব্যাপারে আজ সোমবার সকালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এনবিআরের শাটডাউন কর্মসূচির কারণে মুখ থুবড়ে পড়া দেশের ১৯টি বেসরকারি আইসিডিতেও গতকাল রোববার রাত থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপ–কমিশনার মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, এনবিআরের ডাকা কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সন্ধ্যা থেকে রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামীকাল (আজ) থেকে পুরোদমে কাজ চলবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুদিনে আটকা পড়া অন্তত ৪ হাজার টিইইউএস রপ্তানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার জাহাজিকরণ করে স্বাভাবিক গতি আনতে কয়েকদিন সময় লাগবে। তবে এসব পণ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে। রপ্তানি পণ্যগুলো গত দুদিনে জাহাজিকরণ হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল এসব পণ্য নিয়ে জাহাজ সিঙ্গাপুর বা কলম্বো গিয়ে ইউরোপ–আমেরিকামুখী মাদার ভ্যাসেল ধরবে। অথচ এনবিআরের শাটডাউনের ফলে পণ্যগুলো মাদার ভ্যাসেল শেষ পর্যন্ত পাবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মাদার ভ্যাসেল ধরতে না পারলে এসব পণ্য শেষ পর্যন্ত ক্রেতারা নেবেন কিনা তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যবসায়ী–শিল্পপতিরা।

গত দুদিন ধরে বিমানবন্দর রোডসহ সন্নিহিত এলাকার সড়কে শত শত পণ্যবাহী গাড়ি অলস সময় কাটাচ্ছিল। গত রাত থেকে সেগুলো ধীরলয়ে নড়াচড়া শুরু করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘিরে দেশের অন্যান্য শুল্ক স্টেশনের মতো চট্টগ্রাম কাস্টমসের সর্বস্তরের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা অফিসে তালা মেরে কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। দিনভর তৎপরতার মধ্যে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে ব্যবসায়ী নেতাদের অনুরোধে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।

গত দুদিনে ভ্যাট, ইনকাম ট্যাঙ ছাড়াও শুধুমাত্র চট্টগ্রাম কাস্টমস খাত থেকে সরকার প্রায় ৪শ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমদানি পণ্য শুল্কায়ন শুরু না হওয়া পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আয়ে গতি আসবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, এনবিআরকে দুই ভাগ করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে চালু করার অধ্যাদেশ জারির জের ধরে সরকারের সাথে ভ্যাট ও শুল্কসহ রাজস্ব আহরণকারী বিভাগগুলোর টানাপোড়েন শুরু হয়। জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে এনবিআরের আওতাভুক্ত ট্যাঙ–ভ্যাটসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা–কর্মচারীরা আন্দোলন শুরু করেন। এতে শুল্ক ও ভ্যাট আদায়সহ সার্বিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের আগে এনবিআর কর্মকর্তা–কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করা হয়। সরকারের ওই আশ্বাসের পর সকলে কাজে যোগ দিলেও তারা এনবিআরের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রহমান খানের পদত্যাগের দাবিতে অটল থাকেন। এনবিআর চেয়ারম্যানকে সংস্থায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় এনবিআর চেয়ারম্যান অফিসে কাজে যোগ দেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, এনবিআর চেয়ারম্যান দায়িত্বে এসে আন্দোলনে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা, সেমিনার করার জন্য কক্ষ বরাদ্দ না দেওয়াসহ বেশ কিছু বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এরই জের ধরে সব পক্ষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে রাজস্ব খাতের সংস্কার, এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে গত শনিবার ভোর ৬টা থেকে সারা দেশের ভ্যাট ও শুল্ক–করসহ এনবিআরের আওতাধীন সবগুলো কার্যালয়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করা হয়। এরই জের ধরে সারা দেশে শুল্ক–কর ও ভ্যাট আদায়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে।

গতকাল দেখা গেছে, গেট বন্ধ। ভিতরে প্রতিটি কক্ষে তালা ঝুলছে। একজন কর্মকর্তা–কর্মচারীও কাজে নেই। পুরো কাস্টমস হাউজ খা খা করছে। কয়েকজন কর্মচারী থাকলেও তারা কোনো কাজ করছেন না বা কথা বলছেন না। একজন বললেন, শাটডাউন মানেই সবকিছু বন্ধ। কোনো কাজ হবে না। ইনকাম ট্যাঙ এবং ভ্যাট অফিসের কার্যক্রমও একইভাবে বন্ধ রয়েছে। কোথাও কাজ হচ্ছে না।

শাটডাউন কর্মসূচিতে বেকায়দায় পড়েন আমদানি–রপ্তানিকারকরা। তারা প্রয়োজনীয় পণ্য বন্দর থেকে খালাস করতে পারছিলেন না, রপ্তানিকারকরা কোনো পণ্য রপ্তানি করতে পারছিলেন না। আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম থমকে যাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর মূলত অচল হয়ে পড়ে। আগে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাখা জাহাজগুলো থেকে কন্টেনার ইয়ার্ডে নামানো হলেও সেগুলো খালাস করা যাচ্ছিল না। ইতোমধ্যে বন্দরের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠা বেসরকারি আইসিডিগুলোতে কাজ বন্ধ করে দেয় কাস্টমস। ফলে বেসরকারি আইসিডিগুলোতেও কোনো কাজ হচ্ছিল না।

ওই অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়। বন্দরের স্ক্যানিং মেশিনে দায়িত্বরত কাস্টমস কর্মকর্তা কাজ না করায় বন্দরে কোনো রপ্তানি পণ্য প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি দুদিন। আমদানি এবং রপ্তানি দুটোই বন্ধ থাকায় বন্দরের সিংহভাগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। উল্লেখ্য, দেশের সমুদ্রবাণিজ্যের আমদানি–রপ্তানির অন্তত ৯২ শতাংশ পরিচালিত হয় এই বন্দর দিয়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, কাস্টমস আন্দোলন করছে, অথচ ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরকে। দেশের আমদানি–রপ্তানি খাতে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে গার্মেন্টস সেক্টরকে বড় মূল্য দিতে হবে। বন্দরের গেট পর্যন্ত পৌঁছেও সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারা দুঃখজনক। এ অবস্থায় গত রাত থেকে রপ্তানি পণ্য জাহাজিকরণ শুরু হওয়ায় কিছুটা হলেও স্বস্তি দেখা দিয়েছে।