১৪০তম মক্কার বলী খেলাকে কেন্দ্র করে বসেছে মেলা; উপচেপড়া ভিড়

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ঐতিহ্যবাহী মক্কার বলী খেলার ১৪০তম আসর বসে শনিবার (২০ এপ্রিল)। সকাল থেকে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলবে মেলার কার্যক্রম। উপজেলা জুড়ে বলী খেলা ও বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকার লোকজনের মধ্যে বিরাজ করছে বাড়তি আনন্দ-উৎসাহ। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বলী খেলা দেখতে আসা উৎসুক জনতার পদচারণায় লোকারণ্যে পরিণত হয়েছে উপজেলার মাদারসা মক্কার বাড়ি এলাকা।

ঐতিহ্যবাহী মক্কার বলী খেলাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছে হাজারও মৌসুমি ব্যবসায়ী। তারা হরেক পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন। মেলায় উপচেপড়া ভিড় করে ক্রেতারা। তবে উৎসবের মূল আকর্ষণ ‘বলী খেলা’।

কক্সবাজারের রামুর দিদার বলী, উখিয়ার শামসু বলী, টেকনাফের আলম বলী, খুলনার শিপন বলী, যশোরের কামাল বলীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নামকরা প্রায় অর্ধশত বলী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেন। এবারে সাতকানিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মক্কার বলী খেলায় চকরিয়ার বাদশা বলীকে হারিয়ে কক্সবাজারের রামুর দিদার বলী চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

খেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসানুজামান মোল্যা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ শফিউল কবির, মাদর্শা ইউপি চেয়ারম্যান আ. ন. ম সেলিম চৌধুরী, ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মানিক, সাবেক চেয়ারম্যান নাজমুল আলম চৌধুরী প্রমুখ।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন  বলেন, এটি সাতকানিয়ার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মেলা ও বলী খেলা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খেলা শেষে চ্যাম্পিয়ন, রানার্স আপসহ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বলীদের পুরস্কৃত করা হয়েছে।

জানা গেছে, ১৮৭৯ সালে ইয়াছিন মক্কীর নাতি কাদের বক্স চৌধুরী খাজনা দিতে আসা প্রজা ও এলাকার লোকজনকে আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম বলী খেলার আয়োজন করেন। এর পর থেকে এটি মক্কার বলী খেলা নামে পরিচিত লাভ করেন।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বলীদের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই চলছিল একদিকে। অন্যদিকে জমে উঠেছিল হস্তশিল্প আর গ্রামীণ খাবারদাবারের বিকিকিনি। শিশুদের বিনোদনের কমতি ছিল না এ মেলায়। এ রকম উৎসব উপলক্ষ্যে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষের বছরে হাতেগোনা দুই একবারই আসে। সাতকানিয়া মাদার্শা ইউনিয়নে পাহাড়ঘেরা সমতল ভূমিতে জমজমাট মক্কার বলীখেলা দেখতে গত ২০ এপ্রিল শনিবার জড়ো হয়েছিল হাজারো মানুষ। সাতকানিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মক্কার বাড়ির পাহাড় ঘেরা মাঠে এ বলীখেলার ১৪০তম আসর বসেছিল এবার।

টেকনাফ, কক্সাবাজার, রামু, বাঁশখালি, মহেশখালি, মির্জাখীল, লোহাগাড়া খুলনা জেলা হতে থেকে বলী এসেছিল এবারের আসরে। খেলার মূল আকর্ষণ ছিল কক্সবাজারের জীবন বলী, খুলানার রাশেদ বলী ও রামুর দিদার বলী। উক্ত খেলায় দিদার বলী চ্যাম্পিয়ন ও জীবন বলী রানার্স আপ হয়েছেন।

মক্কার বলীখেলা উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী চলছে গ্রামীণ পণ্যের মেলা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মৃৎশিল্পীরা এসেছিল পসরা নিয়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্র, খাবার ও নানা ধরনের খেলনা বিকিকিনি হয়েছে এ মেলায়। বলীখেলা ছিল মেলার মূল আকর্ষণ শনিবার বিকেল ৪টায় আয়োজকরা ঢোল-বাজনার তালে তালে বলীদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামেন। মুহূর্তের মধ্যে মক্কার বাড়ির মাঠ কানায় কানায় ভরে উঠে। দেখতে দেখতে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় মাঠ। জায়গা সংকুলান না হয়ে পাশের উচু পাহাড়ে এবং গাছের ডালে উঠে বসেছে অনেকে বলীখেলা উপেভাগ করার জন্য। খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ছিদ্দিক বলী , বাহার বলী,লালু বলী, জাফর বলী, কলিম বলী, রোবেল বলী , কালাম বলীসহ শতাধিক বলী

খেলার আয়োজক মাদার্শা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নাজমুল আলম চৌধুরী বলেন, ১৩৯ বছর আগে তাঁর দাদা মরহুম মোহাম্মদ আবদুল কাদের বক্স চৌধুরী বাঙালি ঐতিহ্য আর কৃষ্টি ধরে রাখার জন্য এ খেলার আয়োজন করেছিলেন। তাঁর ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ৭ বৈশাখ এ খেলা অনুষ্ঠিত হয়। সাতকানিয়া, বাঁশখালি, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, আনোয়ারা ও বোয়ালখালিসহ আশপাশের গ্রামে বাঁশবেত, মৃৎশিল্প, কৃষিপণ্য ও গৃহস্থালির নানা সামগ্রি বিক্রি হয় বলীখেলা উপলক্ষে বসা এ মেলায়। অনেকে মেলায় আসেন সারা বছরের ব্যবহার্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে।

সোনাকানিয়ার হাতিয়ারকুল এলাকার মোহাম্মদ নাজিম বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মিলন মেলায় পরিণত হয় এ মেলা। আমি প্রতি বছর এ মেলায় আসি কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য। মেলায় তৈজসপত্র বিক্রি করতে আসা সুজন কর্মকার বলেন, প্রতি বছর বৈশাখ আসার পর থেকে দা-খুন্তি, বটি ইত্যাদি তৈরি করতে থাকি এ মেলায় বিক্রি করার জন্য। বিক্রি কেমন হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কি আর বলা লাগে।