এখনও মন পড়ে থাকে বইমেলায় : প্রধানমন্ত্রী

10

অমর একুশে গ্রন্থমেলার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগে যখন ক্ষমতায় ছিলাম না, তখন বইমেলায় এসে অনবরত ঘুরে বেড়াতাম। সত্যি কথা বলতে গেলে মনটা পড়ে থাকে বইমেলায়। শুক্রবার (১ ফেব্রুয়ারি) বিকালে বাংলা একাডেমি চত্বরে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৯’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইমেলা হচ্ছে বাঙালির প্রাণের মেলা। এখন বলতে গেলে এক ধরনের বন্দি জীবনই যাপন করতে হয়, আসার সুযোগ হয় না। আসতে গেলে অন্যের অসুবিধা হয়। অন্যের অসুবিধা নিরাপত্তার কারণে মানুষের যে অসুবিধাগুলো হবে, সেটা বিবেচনা করে আর আসার ইচ্ছাটাও হয় না। আমার জন্য অন্যেরা কষ্ট পাবে। কিন্তু সবসময় সত্যি কথা বলতে কী, মনটা পড়ে থাকে-এই বইমেলায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিক্ষাগ্রহণ করে একটি জাতি আরও উন্নত হতে পারে। দারিদ্র্য-ক্ষুধামুক্ত হতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি। তাই বইয়ের চাহিদা কিন্তু কখনো শেষ হবে না। এটা আমি বলতে পারি। বিজয়: ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ নবপর্যায়’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ থেকে দ্বার খুলল অমর একুশে গ্রন্থমেলার। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এই পর্যন্ত ১৬ বার অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করলেন সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা। লেখক-প্রকাশক-পাঠক আর সাহিত্যপ্রেমীদের দীর্ঘ এক বছরের সকল অপেক্ষার পালা শেষ করে আজ থেকে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাসব্যাপী চলবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা।-ফোকাস বাংলা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটুকু বলতে চাই একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যখন আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল, তখন এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ইউনেস্কো ঘোষণা দেয় এবং এটা আমরা অর্জন করি। বাঙালির ইতিহাস হচ্ছে ত্যাগের ইতিহাস। আর সেই ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমাদের অর্জন। বাংলা একাডেমী এবার একুশে মাসব্যাপী বইমেলা উপলক্ষে সেমিনারের আয়োজন করেছে এ জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন যে জাতির পিতা, স্বাধীনতার পর প্রথম যে ভাষণ দিয়েছিলেন বাংলা ভাষায়। আমিও সরকার গঠন করার পর থেকে যত বার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছি, বাংলা ভাষাই ভাষণ দিয়েছি বলেও জানান শেখ হাসিনা।
আমরা আমাদের শিক্ষাকে সব থেকে গুরুত্ব দেই এবং বছরের ১ম দিন সকল ছাত্রছাত্রীদের হাতে প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সকলের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেই। যাতে তারা লেখাপড়ায় আরও উৎসাহিত হয় এবং বৃত্তি-উপবৃত্তিও দিয়ে থাকি উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বলেও জানান তিনি।কাজেই শিক্ষাগ্রহণ করে একটি জাতি আরও উন্নত হতে পারে। দারিদ্র্য ক্ষুধামুক্ত হতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এ পদক্ষেপ নিয়েছি। এরই মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃথিবীর ১২টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। এটা অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়েও কিন্তু অনুবাদ করে দিয়েছেন। এই অনুবাদও আমাদের একান্তভাবে প্রয়োজন এবং বাংলা একাডেমি সেটা করে থাকে। কারণ বিশ্বসাহিত্যকে জানার জন্য অনুবাদ একান্তভাবে প্রয়োজন এবং আমাদের সাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় জানা, এটাও প্রয়োজন।
সেই দিক থেকে বাংলা একাডেমি এই অনুবাদ কাজগুলো করছে তার জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, বর্তমান যুগ ডিজিটাল যুগ। এটা ঠিক যে, এখন ছেলেমেয়েরা হাতের মধ্যে একটা। এখন মোবাইল ফোনেই সব পাওয়া যায়। আবার কেউ ছোট ছোট ডিভাইস ব্যবহার করেন হাতে একটা যন্ত্র নিয়ে পড়া সত্যি কথা বলতে কি? আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়ে দেখি আমি, ওটা পড়ে কিন্তু শান্তিটা পাওয়া যায় না। বইয়ের পাতা উল্টিয়ে উল্টিয়ে পড়ার মধ্যে যে একটা আনন্দ সেই আনন্দটা সব সময় আমরা পেতে চাই। তাই বইয়ের চাহিদা কিন্তু কখনো শেষ হবে না। এটা আমি বলতে পারি। যতই আমরা যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করি না কেন কিন্ত ওই যে বইয়ের মলাট, একটা বই বুক শেলফে রাখা, এবং সেটা পড়ার মাঝে আলাদা একটা আনন্দ আছে বলেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারপরও আমি বলব, অনলাইনে থাকলে সারাবিশ্বের কাছে এবং সকলের কাছে খুব দ্রুত পৌঁছানো যায়। কাজেই ডিজিটাল লাইব্রেরি হওয়া এটাও একান্তভাবে প্রয়োজন। সেটা জরুরি বলে আমি মনে করি। আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করব। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। সেই লক্ষ্য মাথায় রেখেই আমাদের যে ভাষা আন্দোলনের সময় সেটাও জন্য আমাদের জন্য একান্তভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মধ্য দিয়ে এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের ইতিহাসকে আরও স্বচ্ছভাবে দেশের মানুষের কাছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারব বলে বিশ্বাস করি যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা দেশকে আজকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছি। এখন আমরা উন্নয়নশীল দেশ আর্থ-সামাজিকভাবে বাংলাদেশ আরও উন্নত সমৃদ্ধশালী হোক, সেটাই আমরা কামনা করি। বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে, বাঙালি জাতি সারাবিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে, বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে উঠবে এই বাংলাদেশ; যেখানে জঙ্গিবাদ দুর্নীতি বা মাদক কোনো কিছুর স্থান থাকবে না। বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ায় সবথেকে উন্নত সমৃদ্ধ শান্তিপ্রিয় একটি দেশ। যা জাতির পিতা চেয়েছিলেন। কাজেই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ ইনশা আল্লাহ আমরা গড়ে তুলবো, সেটাই আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
উদ্বোধনী স্মারকে স্বাক্ষর করে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯’র শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ২০১৮ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কবিতায় কাজী রোজি, কথাসাহিত্যে মোহিত কামাল, প্রবন্ধে সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় আফসান চৌধুরী।
সেই সঙ্গে হাক্কানী পাবলিশার্স প্রকাশিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস্ অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-ভলিউম-২, (১৯৫১-১৯৫২) এর মোড়ক উন্মোচন করেন শেখ হাসিনা। এছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত মোহসেন আল-আরিশি রচিত বইয়ের অনুবাদ শেখ হাসিনা : যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়’ বইটি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ এবং মিশরের লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক মোহসেন আল-আরিশি, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনীর সভাপতি ফরিদ আহমেদ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী রামেন্দু মজুমদার।অনুষ্ঠানে সুরের ধারার শিল্পীরা শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের পর পুনরায় সুরের ধারায় শিল্পীরা সূচনা সংগীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন। এরপর ভাষা শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।